মুঘল সভ্যতা-সংস্কৃতি : মুঘলদের পতন | Mughal Civilization-Culture: Fall of Mughals |Part 1

Mughal Civilization-culture

১. প্রশ্ন : জায়গীরদারী ব্যবস্থা বলতে কি বোঝ ?

উত্তর : ‘জায়গীর’ শব্দের অর্থ জমির এক অংশ। যাঁরা এই জমির অংশ বা জায়গীর লাভ করতেন। ‘তারাই ‘জায়গীরদার’ বলে অভিহিত হতেন । অভিজাত ব্যক্তিরা মুঘলযুগে প্রশাসনিক ও সামরিক দায়িত্ব পালনের জন্য নগদ বেতন পেতেন। অনেকে আবার নগদ বেতনের পরিবর্তে জায়গীর পেতেন। এই শ্রেণীর অভিজাতদেরই ‘জায়গীরদার’ বলা হত ।

মুঘল যুগে জায়গীরদার ব্যবস্থা একটি প্রশাসনিক ও সামরিক ব্যবস্থা হিসাবে গড়ে উঠেছিল । জায়গীরদাররা তাদের এলাকায় বসবাসকারী কৃষক-প্রজাদের কাছ থেকে ভূমি-রাজস্ব আদায় করতেন –ভূমি-রাজস্ব হিসাবে আদায় করা অর্থ থেকে জায়গীরদাররা নিজেদের ব্যক্তিগত খরচ-খরচা চালানো ব্যতীত সৈন্যবাহিনীরও ভরণ-পোষণ করতেন। জায়গীরদাররা প্রয়োজনে যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যসামন্ত নিয়ে হাজির থাকতে বাধ্য ছিলেন। জায়গীরদারদের সর্বদাই সরকারী নিয়মনীতি মেনে চলতে হত । তাছাড়া জায়গীরদারকে বদলি করা হত এক জায়গা থেকে অপর জায়গায়। আবার তারা বংশানুক্রমিকভাবেও জায়গীরের ভোগদখল করতেন না। এতসব কড়াকড়ি সত্ত্বেও জায়গীরদাররা সর্বদাই স্বাধীনভাবে চলবার চেষ্টা করতেন এবং সরকারী নির্দেশ অমান্য করে বেআইনী কাজকর্ম করতে অভ্যস্ত ছিলেন। মুঘল যুগের শেষদিকে এই জায়গীরদারী ব্যবস্থায় সংকট দেখা দিয়েছিল। যার পরিণতিতে কেবল জায়গীরদারী ব্যবস্থাটাই ভেঙ্গে পড়েনি, মুঘল সাম্রাজ্যের ভাঙ্গন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল ।

২ . প্রশ্ন : জায়গীরদারী সমস্যা বলতে কি বোঝায় ?

উত্তর : জায়গীরদারী ব্যবস্থা মুঘল প্রশাসন এবং সামরিক ব্যবস্থার স্তম্ভস্বরূপ ছিল। জায়গীরদাররা সম্পূর্ণভাবে ছিলেন সরকারী নিয়ন্ত্রণাধীন । এই ব্যবস্থায় জায়গীরদারদের কতকগুলি কর্তব্য পালন করতে হত । তাছাড়া একজন জায়গীরদারকে ক্রমাগত এক জায়গা থেকে অপর জায়গায় বদলি করা হত অথবা তার জায়গীর কেড়ে নেওয়া হত। মুঘল সাম্রাজ্যের সীমানা যত বাড়তে থাকে জায়গীরদারদের সংখ্যাও ততই বেড়ে চলেছিল। এমন এক সময় এসেছিল যখন জায়গীরের অভাবে জায়গীরদারকে তা বিলি করা আর সম্ভব হয়নি। তাছাড়া মুঘল সম্রাটের দুর্বলতার সুযোগে আওরংজেবের পরবর্তী কালে জায়গীরদাররা স্বাধীন হয়ে উঠতে থাকেন। তাঁরা সরকার কর্তৃক ধার্য করা নির্দিষ্ট কর ব্যতীত অতিরিক্ত কর আদায়ের জন্য কৃষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। এইভাবে জায়গীরদারী ব্যবস্থায় সংকট উপস্থিত হয়েছিল ।

জায়গীরদারী ব্যবস্থার যে সংকট মুঘল সাম্রাজ্যকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছিল তার মূলে অবশ্য ছিল জায়গীরের তুলনায় জায়গীর প্রাপকের সংখ্যা বৃদ্ধি। জাহাঙ্গীর এবং শাহজাহান উদার হাতে জায়গীর বিলি করেছিলেন। তারপরে আওরংজেব তাঁর আমলে অনুষ্ঠিত বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করবার জন্য বিপুল সংখ্যক জায়গীর বিলি করেন। মারাঠাদের দমন করবার জন্যও অনেক অভিজাতকে জায়গীর দিয়ে দলে টানা হয়েছিল । আওরংজেবের পরবর্তী সময়ে জায়গীরদারের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তার পাশাপাশি জায়গীরের পরিমাণ তো আর তেমনভাবে বাড়েনি । যার ফলে অভিজাতদের মধ্যে দলাদলি শুরু হয়েছিল । তাছাড়া আরও অন্যান্য সমস্যা জায়গীরদারী ব্যবস্থাকেই বিপন্ন করে তুলেছিল।

৩. প্রশ্ন: মুঘল শিল্পকলা সম্পর্কে সংক্ষেপে যা জান লেখ ।

উত্তর : মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর ভারতে আসবার সময় পারস্য থেকে দুজন চিত্রশিল্পীকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন । তাদের উদ্যোগেই এদেশে মুঘল চিত্রকলার ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়। আর আকবর ফতেপুর সিক্রীতে দালান-প্রাসাদ নির্মাণ করিয়ে ভারতবর্ষে মুঘল স্থাপত্যের সূচনা করেছিলেন। এইভাবে চিত্রকলা এবং স্থাপত্য, এই দুই নিয়েই মূলত মুঘল শিল্পকলার ইতিহাস গড়ে উঠেছে ।

মুঘল স্থাপত্যরীতিতে কোনও মৌলিকতা লক্ষ্য করা যায় না বলে কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করলেও আধুনিক শিল্প-বিশেষজ্ঞরা মুঘল স্থাপত্যকে একটি বিশিষ্ট স্থাপত্যরীতি হিসাবেই দেখেছেন । আকবর ফতেপুর সিক্রীতে যে দালান নির্মাণ করেছিলেন তাতে মধ্য-এশিয়ার প্রভাব লক্ষণীয় । তবে শাহজাহানের আমলে মুঘল স্থাপত্যের চরম বিকাশ ঘটেছিল। শাহজাহানের আমলে নির্মিত তাজমহল, জুম্মা মসজিদ, দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস প্রভৃতি মুঘল স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন । এইসব স্থাপত্য নিদর্শনে কারুকার্য এবং গঠনশৈলী-ই ছিল মূল কথা। আওরংজেব অবশ্য স্থাপত্যশিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করেননি, যার ফলে তাঁর আমলে এই শিল্পে ভাঁটা পড়েছিল ।

মুঘল চিত্রকলার সূচনা বাবরের আমল থেকেই। আকবর নিজে চিত্রকলার কদর করতেন বলে তাঁর আমলে গায়ক এবং ঐতিহাসিকদের মতো চিত্রশিল্পীরাও সমাদৃত হন। যশোবন্ত এবং দাসোয়ান ছিলেন আকবরের সমসাময়িক দুইজন চিত্রকর । আকবরের পরবর্তী কালে জাহাঙ্গীর এবং শাহজাহানের আমলেও চিত্রকলার উন্নতি অব্যাহত ছিল । তবে আওরংজেবের আমলে সংস্কৃতির অপরাপর শাখার মতো চিত্রকলারও অবনতি শুরু হয়ে যায় । রাজধানীর চিত্রকররা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা বিভিন্ন প্রাদেশিক রাজধানীর দরবারে সম্মান লাভ করতে থাকেন। যার ফলে আওরংজেবের পরবর্তী সময়ে প্রাদেশিক বা স্থানীয় চিত্রশৈলী গড়ে উঠেছিল। এইভাবেই গড়ে ওঠে রাজস্থান এবং কাংড়ার বিশিষ্ট শিল্পশৈলী ।

৪. প্রশ্ন : মুঘল শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে যা জান সংক্ষেপে লেখ ।

উত্তর : ক. সূচনা : মুঘল শাসনব্যবস্থা পারসিক এবং আরবীয় শাসনব্যবস্থার অনুসরণে রচিত হলেও আকবর তাতে নতুন কিছু বৈশিষ্ট্যের প্রবর্তন করেছিলেন । অবশ্য এব্যাপারে আকবর আবার শের শাহের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হন । জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর প্রজাদের প্রতি সমান ব্যবহার এবং প্রজাদের কল্যাণ সাধনের আদর্শকে বাস্তবায়িত করবার প্রয়াস মুঘল শাসন-পদ্ধতির মধ্যে লক্ষণীয় ।

খ. স্বৈরাচারী, কিন্তু স্বেচ্ছাচারী শাসন নয় : মুঘল শাসনব্যবস্থাকে স্বৈরাচারী বলে অভিহিত করা যেতে পারে। কারণ এই শাসনব্যবস্থায় মুঘলসম্রাট ছিলেন এমন একজন শাসনকর্তা যাঁর ক্ষমতার কোনও সীমা নেই । তাঁর অধীন উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা সম্রাটকে পরামর্শ দিতেন ঠিকই। কিন্তু সেই পরামর্শ গ্রহণ করা বা না-করা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করত সম্রাটের ওপর। তা সত্ত্বেও একথা নিশ্চয়ই মহান চার পাঁচজন মুঘলসম্রাট সম্পর্কে বলা যেতে পারে যে, তাঁরা শাসনকার্য পরিচালনায় জনসাধারণের কল্যাণ সাধনের দিকটা বড় করে দেখতেন।

গ. কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাসন কেন্দ্রীয় শাসনে সম্রাট সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হলেও বিশালায়তন সাম্রাজ্যকে একার পক্ষে শাসন করা সম্ভব হত না। যে-কারণে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যেমন রাজকর্মচারী ছিলেন, তেমনি প্রাদেশিক শাসনকর্তারা নিজ নিজ এলাকায় কেন্দ্রীয় নীতি কার্যকর করতেন। সুবাদার, ফৌজদার প্রভৃতি কর্মচারীরা প্রাদেশিক পর্যায়ে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তবে প্রাদেশিক পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মচারীর মধ্যে এমনভাবে ক্ষমতা বণ্টন করা হত যাতে তারা মিলিত হয়ে ও সম্রাটের বিপদ ঘটাতে না পারেন ।

ঘ. রাজস্ব-ব্যবস্থা : কৃষিকাজ ছিল মুঘল আমলে মানুষের প্রধান উপজীবিকা । যে-কারণে সরকারী আয়ের প্রধান উৎস ছিল ভূমি-রাজস্ব। শের শাহের কথা বাদ দিলে আকবর-ই ছিলেন প্রথম মুঘলসম্রাট যিনি ভূমি রাজস্বকে একটা স্থায়ী ভিত্তিতে দাঁড় করাতে পেরেছিলেন। আর এই ব্যাপারে তাঁর প্রধান সহায়ক ছিলেন তোডরমল। সমগ্র মুঘল যুগ ধরে তোডরমলের বন্দোবস্ত-ই ছিল মুঘল ভূমি-রাজস্বের প্রধান ভিত্তি।

ঙ. মুঘল বিচারব্যবস্থা : মুঘল আমলে বিচারব্যবস্থা বর্তমান কালের মতো সুগঠিত ছিল না। ‘কাজীর বিচার’ কথাটি থেকেই তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় । তবে ছোট বা বড় শহরমাত্রেই বাদশাহী বিচারালয়ের অস্তিত্ব ছিল। আর গ্রামাঞ্চলে স্থানীয় জমিদার বা বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরা ছোট-খাট অপরাধের বিচার করতেন। চ. সামরিক ব্যবস্থা : মুঘল শাসনে সামরিক ব্যবস্থা একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল ।

চ. সামরিক ব্যবস্থা : মুঘল শাসনে সামরিক ব্যবস্থা একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল । মনসবদারী ব্যবস্থার প্রবর্তন করে আকবর মনসবদারদের ওপর যুদ্ধে প্রয়োজনীয় ঘোড়া, হাতি প্রভৃতি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাছাড়া নানা ধরনের সৈন্য যেমন : পদাতিক, বন্দুকবাজ প্রভৃতি নিয়োগ করে আকবর সামরিক বাহিনীকে সুগঠিত একটি সংস্থায় পরিণত করেছিলেন ।

এইভাবে মুঘল শাসনব্যবস্থা সকল দিক থেকেই উল্লেখের দাবী রাখে। রাজদরবারের অভিজাত থেকে শুরু করে গ্রামের সামান্যতম মানুষও এই শাসনের প্রভাব এবং মুঘলসম্রাটের কর্তৃত্ব অনুভব করত।সবশেষে বলা যেতে পারে যে, ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে মুঘল শাসনব্যবস্থার অনেক বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত রয়েছিল।

৫. প্রশ্ন: মুঘল সাম্রাজ্যের পতনে আওরংজেবের দয়িত্ব কতখানি ছিল ?

উত্তর : ক. সূচনা : প্রকৃতির নিয়ম অনুসারেই সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন ঘটে থাকে। সেদিক দিয়ে বিচার করলে কোন সাম্রাজ্যের পতনে ব্যক্তির ভূমিকা তেমন বড় কিছু নয়। তা সত্ত্বেও মনে রাখতে হবে। যে, সেযুগে রাজা, সুলতান বা বাদশা-ই ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তা এবং সকল ক্ষমতার আধার। তখন রাজ্য বা সাম্রাজ্যের ইষ্ট-অনিষ্ট অনেকখানি নির্ভর করত সেই রাষ্ট্রনেতার ব্যক্তিগত কর্মকুশলতার ওপর। মহান মুঘলসম্রাটদের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য আওরংজেবের মৃত্যুর পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। এই সূত্রে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনে আওরংজেবের দায়িত্বের কথা অনিবার্যভাবেই এসে পড়ে।

খ. আওরংজেবের অনুসৃত নীতি : সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে, আকবরের অনুসৃত উদারনীতি থেকে সরে এসে আওরংজেব ভুল করেছিলেন। তাঁর গোঁড়াপন্থী ধর্মনীতি হিন্দুদের বিদ্বেষভাবাপন্ন করে তুলেছিল। আওরংজেবের রাজত্বকালে ভারতের সর্বত্র যে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল তা আওরংজেবের ধর্মনীতির-ই কুফল। অ-মুসলিমদের ওপর জিজিয়া কর আরোপ, অ-মুসলিমদের ধর্ম-প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী প্রভৃতি স্বাভাবিকভাবেই হিন্দু সম্প্রদায়কে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। অথচ আকবর হিন্দু-মুসলিম-নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতার ভিত্তিতে জাতীয় সম্রাটের মর্যাদা লাভ করেছিলেন।

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনে আওরংজেবের দায়িত্ব নির্ণয় করতে তাঁর রাজু ত নীতি এবং মারাঠা নীতিকে ও দায়ী করা হয়ে থাকে। আকবর রাজপুতদের বীরত্বকে মর্যাদা দিয়েছিলেন। রাজপুতদের সঙ্গে তিনি সংঘর্ষের পরিবর্তে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। রাজপুতদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন ব্যতীত আকবর তোডরমল, মানসিং প্রমুখ কর্মদক্ষ ব্যক্তিকে শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। রাজপুতদের সমর্থনে সাম্রাজ্যের ভিত্তি যে সুদৃঢ় হয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আওরংজেব রাজপুতদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে তাদের মর্যাদাকে আহত করেছিলেন। আওরংজেবের রাজপুত নীতি তাদের শত্রুভাবাপন্ন করে তুলেছিল। অনুরূপভাবে মারাঠা নীতি পরিচালনায়-ও আওরংজেব অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এইভাবে আওরংজেব যে নীতিসমূহ গ্রহণ করেছিলেন তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসাবেই নাকি মুঘল সাম্রাজ্যের পতন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

গ. প্রকৃত দায়িত্ব কতখানি : একথা অনস্বীকার্য যে, আওরংজেব একজন গোঁড়া সুন্নী মুসলিম হিসাবে। ইসলামের অনুশাসনকে ভারতবর্ষে কার্যকরী করতে চেয়েছিলেন। আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণায় একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, একজন শাসক হিসাবে আওরংজেব তাঁর সাম্রাজ্যের শক্তিকে সুদৃঢ় করতে অবশ্যই চেয়েছিলেন ; এবং তা করতে গেলে অ-মুসলিমদের সহযোগিতা যে একান্ত প্রয়োজন তা তিনি উপলব্ধিও করেছিলেন। তবে ব্যক্তিগত ধর্মনিষ্ঠা এবং তাঁর রাজনৈতিক নীতির মধ্যে অবশ্যই কিছু বিরোধিতা দেখা দিয়েছিল। তাছাড়া আওরংজেবের আমলে যে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল তা যে কেবল তাঁর ধর্মান্ধ নীতিরই পরিণতি একথা আধুনিক গবেষকরা মানতে রাজী নন। কারণ জাঠ, সৎনামী বা অন্যান্য জাতি বিদ্রোহে আর্থ-সামাজিক কারণের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

বস্তুতপক্ষে মুঘল সাম্রাজ্য এমন কিছু মৌলিক ব্যাধিতে ভুগছিল যা থেকে রেহাই পাওয়া এক রকম অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অভিজাতদের মধ্যে দলাদলি, জায়গীরদারী সমস্যা প্রভৃতি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে এক রকম অনিবার্য করে তুলেছিল। এইসবের পরিপ্রেক্ষিতে আওরংজেবকে এককভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য দায়ী করা সমীচীন নয়।

ঘ. মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের প্রকৃত কারণ : মুঘল আমলের শেষদিকে কৃষি-ব্যবস্থায় বৈচিত্র্যহীনতার দরুন কৃষি-উদ্বৃত্ত আর তেমনভাবে সৃষ্টি হতে পারেনি। অথচ বাড়তি খরচ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকলে আয়-ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা সম্ভব হয়নি। অভিজাত গোষ্ঠীর মানুষ সাম্রাজ্যের ভিত্তি হিসাবে তাকে দুর্বল থেকে দুর্বল করে তুলছিল নিজেদের স্বার্থের খাতিরে। আবার মুঘল যুগের শেষদিকে জায়গীরদারী সমস্যাকে কেন্দ্র করে অভিজাতদের মধ্যে দলাদলি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। অভিজাতদের এক একটি দল চাইছিল কি করে তাদের নিজেদের গোষ্ঠীর লোকজনকে জায়গীর পাইয়ে দেওয়া যায়। আর তাতে করে অভিজাতদের বিভিন্ন দলের মধ্যে যে রেষারেষি দেখা দিয়েছিল তাতে সাম্রাজ্যের পতনের পথই কেবল প্রশস্ত হয়েছিল।

একদিকে অর্থনৈতিক বিপর্যয় যখন মুঘল সাম্রাজ্যকে সংকটাপন্ন করে তুলেছিল তখন বৈদেশিক আক্রমণকারীরা প্রচুর সম্পদ এদেশ থেকে লুঠপাট করে নিয়ে যাবার ফলে রাজকোষে অর্থ-সংকট চরমে পৌঁছায়। এইসব কারণের সমষ্টিগত ফল হিসাবেই মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল। যাঁরা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য আওরংজেবের ধর্মান্ধ নীতিকে এককভাবে দায়ী করবার পক্ষপাতী তাঁদের স্মরণ রাখতে হবে যে, অভিজাতদের দলাদলি, জায়গীরদারী সংকট বা বৈদেশিক আক্রমণের জন্য আওরংজেব একা দায়ী ছিলেন না ।

Leave a Comment