মুঘলযুগে ভারত | India in Mughal Period|Part 1

১. প্রশ্ন: বাবরের আত্মজীবনীর উপর টীকা লেখ ।

উত্তর : ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে বাবরের নাম স্মরণীয় হয়ে আছে। তিনি পানিপথের প্রথম যুদ্ধে জয়লাভ করবার ফলেই ভারতে মুঘলদের রাজনৈতিক অধিকার স্থাপিত হয় কিন্তু রাজনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও বাবর শিক্ষা এবং বিদ্যাচর্চাকে অবহেলা করেননি তিনি তাঁর যে জীবনস্মৃতি বা তুজুক-ই বাবরী রচনা করেন তা থেকে ভারতবর্ষের তদানীওন অবস্থার সম্পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় ।

বাবরের আত্মজীবনীতে স্থান পেয়েছে সমসাময়িক ভারতের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন। তাছাড়া এদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং শিল্পকলা সম্পর্কেও বাবর তাঁর নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করেছেন। যে কারণে বলা যায় যে তুজুক-ই-বাবরী সমসাময়িক ভারতের ঐতিহাসিক দলিলের মর্যাদা লাভ করেছে। বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণে বাবর সর্বদা যে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করেছিলেন তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বাবরের আত্মজীবনীতে সুলতানী যুগের শেষ দিকে ভারতীয় সমাজের অধঃপতনের যে চিত্র ফুটে ওঠে তা কল্পনামাত্র নয়, বাস্তব ঘটনাই বটে।

২. প্রশ্ন: পানিপথের প্রথম যুদ্ধের গুরুত্ব কি ছিল ?

উত্তর : বাবর ভারতবর্ষ সম্পর্কে জানতে উৎসাহী ছিলেন। তাছাড়া পিতৃরাজ্য হারিয়ে বাবর যখন একরকম যাযাবরের মতো জীবন যাপন করছেন তখন ভারতবর্ষে উপস্থিত হলে তাঁর যে ভাগ্যরবি আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠবে এই আশা পোষণ করছিলেন। ইতিমধ্যে ইব্রাহিম লোদীর দুর্বল শাসনে উত্যক্ত হয়ে দিল্লীর অভিজাতরা যখন বাবরকে ভারত আক্রমণের আমন্ত্রণ জানাল তখন তিনি সেই সুযোগ হাতছাড়া করেননি ।

১৫২৬ খ্রীস্টাব্দে পানিপথের প্রান্তরে যে যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় তা-ই ইতিহাসে প্রথম পানিপথের যুদ্ধ নামে অভিহিত । এই যুদ্ধে বাবর ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে ভারতবর্ষে মুঘল শাসনের সূচনা করেন । ঐতিহাসিক দিক দিয়ে বিচার করলে তাই এই যুদ্ধ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, পানিপথের আগেও বাবর ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছিলেন । কিন্তু তাতে তিনি তেমন সফল হননি । কিন্তু পানিপথের প্রথম যুদ্ধে সফল হওয়ায় ভারতে মুঘল রাজত্বের সূচনা হয়। দ্বিতীয়ত, বাবর ১৫১৯ খ্রীস্টাব্দের মধ্যেই উত্তর-পশ্চিম ভারতের কিছু এলাকা দখল করে নিয়েছিলেন। কিন্তু পানিপথের প্রথম যুদ্ধে জয়লাভ করায় দিল্লী এবং আগ্রা তাঁর নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। তৃতীয়ত, দিল্লী দখল করবার ফলে রাজ্যহারা বাবর আর্থিক দিক দিয়ে নিজেকে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন । এই অর্থের সাহায্যে পরবর্তী কালে তিনি অভিজাতদের নিজপক্ষে টানতে পেরেছিলেন । চতুর্থত, বলা যেতে পারে যে, পানিপথের প্রথম যুদ্ধের পর থেকেই ভারতবর্ষে আবার মুঘল আফগান দ্বন্দ্বের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল ।

৩. প্রশ্ন: পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধের গুরুত্ব নির্ণয় কর ।

উত্তর : পানিপথের প্রথম যুদ্ধে জয়লাভ করে বাবর ভারতবর্ষে মুঘল শাসনের সূচনা করেছিলেন । আর • পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়লাভ করে আকবর মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছিলেন । আকবর সিংহাসন লাভের সময় নবগঠিত মুঘল সাম্রাজ্য খুবই বিপত্তির মধ্যে পড়েছিল। আকবর তখন দিল্লীর বাইরে ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতির সুযোগে আদিল শাহ শূরের মন্ত্রী হিমু বিক্রমজিৎ’ নাম গ্রহণ করে দিল্লীর সিংহাসন দখল করে নিয়েছিলেন। এই সংবাদ পাওয়ামার আকবর সসৈন্যে দিল্লী অভিমুখে যাত্রা করেন। হিমুকে পরাস্ত করতে ।

পানিপথের প্রান্তরে আকবরের নেতৃত্বে মুঘল বাহিনী হিমুর সৈন্যবাহিনীর মুখোমুখি হয় । ১৫৫৬ খ্রীস্টাব্দে অনুষ্ঠিত এই যুদ্ধ ইতিহাসে ‘পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন, আর হিন্দুর বাহিনী পরাজিত ইতিহাসে পানিপণের দ্বিতীয় ে গুরুত্বকে কোনমতেই অস্বীকার করা যায় না। প্রথমত, পানিপথের এই দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়লাভ না করতে পারলে মুঘল সাম্রাজ্য এবং মুঘল মহিমা বলে সাধারণভাবে আমরা যে কথা দুটি শুনতে পাই তা আর স হত না । প্রকৃতপক্ষে এই যুদ্ধে জয়লাভ করে মুঘল সৈনাবাহিনী যেন নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠে। এই শক্তি নিয়েই তারা আকবরের নেতৃত্বে বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য গঠন করেছিল। দ্বিতীয়ত, পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধকে মুঘল-আফগান দ্বন্দ্বের এক নতুন পর্যায় বলে অভিহিত করা যেতে পারে। আফগানরা এই পরাজয়ের পরবর্তী কালে আর তেমনভাবে শক্তি সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি। মাঝেমধ্যে কোনও কোনও আফগান নেতা বিদ্রোহী হয়ে উঠলেও মুঘল সাম্রাজ্যকে টলাবার মতো ক্ষমতা তাদের আর ছিল না।

৪ । প্রশ্ন: জায়গীরদারী প্রথা’ বলতে কি বোঝ ?

উত্তর : জায়গীরদারী ব্যবস্থা হল মুঘলযুগের প্রশাসনিক ও সামরিক একটি ব্যবস্থা । এই ব্যবস্থায় অভিজাত ব্যক্তিদের অনেকে নিজেদের খরচ বা ব্যয়ভার বহন এবং সৈন্যদের ভরণ-পোষণের জন্য নগদ বেতনের পরিবর্তে জায়গার এক অংশ বা ‘জায়গীর’ (বা জাগীর) লাভ করতেন। যেসব অভিজাতরা এই প্রকার ‘জায়গীর’ লাভ করতেন তাদের জায়গীরদার বলা হত।

জায়গীরদাররা তাঁর এলাকায় বসবাসকারী কৃষক প্রজাদের কাছ থেকে ভূমি-রাজস্ব আদায় করতেন ভূমি-রাজস্ব হিসাবে আদায় করা অর্থ থেকে জায়গীরদাররা নিজেদের ব্যক্তিগত খরচ-খরচা ব্যতীত সৈন্যবাহিনীর খরচ সংকুলান করতেন। এইসব অশ্বারোহী সৈন্যবাহিনীকে সম্রাটের প্রয়োজনে যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির করানোর দায়িত্ব পালন করতে হত জায়গীরদারদের মুঘল ব্যবস্থা অনুসারে জায়গীরদারকে সর্বসময়েই নিয়মনীতি মেনে চলতে হত। তিনি নিজের ইচ্ছানুসারে চলতে পারতেন না। তবে অনেক ক্ষেত্রেই জায়গীরদাররা স্বাধীনভাবে চলবার চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে সম্রাটের দুর্বলতার ফলে প্রশাসন যন্ত্র যখন দুর্বল হয়ে পড়তো তখন জায়গীরদাররা তার সুযোগ নিতে কসুর করেননি। মুঘল সম্রাট আওরংজেবের মৃত্যুর পরে দুর্বল মুঘল সম্রাটদের আমলে অভিজাতদের সংখ্যা যেমন বেড়েছিল তেমনি জায়গীরদারের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়ে চলেছিল ক্রমাগত। কিন্তু জায়গীরের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমে যাবার ফলে এক সমস্যা মুঘল প্রশাসনে দেখা দেয়।

৫. প্রশ্ন: টীকা লেখ : আকবরের রাজসভা।

উত্তর : মুসলিমদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই ভারতবর্ষে রাজদরবারের জাঁকজমক এবং আদব-কায়দা’র ঐতিহা তৈরী হয়েছিল। ইতিপূর্বে প্রাচীন আমলের রাজা বা সম্রাটরা আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপন করলেও দরবারী আদব-কায়দা বা আঁকজমক বলতে যা বোঝায় তার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন বলে জানা যায় না। সুলতানী আমলের তুলনায় অবশ্য মুঘল সম্রাটদের দরবারে চমক ছিল অনেক বেশি । পারসিক ঐতিহ্য অনুসারে জাঁকজমকপূর্ণ দরবারের অস্তিত্ব সুলতানী আমল থেকেই লক্ষ্য করা যায় । তবে মহান মুঘল সম্রাট আকবরের ব্যক্তিত্ব এবং ক্ষমতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে তাঁর দরবার-ও ছিল অতি মনোরম। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল এই যে, আকবর তাঁর আমলে দরবারে নতুন কিছু বৈশিষ্ট্যের ও সূচনা করেছিলেন । প্রথমত, মুঘল সম্রাটদের মধ্যে প্রথম আকবরের সময় থেকেই বিশাল অট্টালিকা ও প্রাসাদ স্থাপন শুরু হয় ইবাদতখানা, ফতেপুর সিক্রীর অট্টালিকাসমূহ প্রভৃতি এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয়ত, আকবরের আমল থেকে বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নতুন নতুন উৎসবের আয়োজন করতেন। যেমন, বসন্তোৎসব। বসন্তোৎসব উপলক্ষে ফলের বাগানে নানা গুণীজন গানবাজনা করতেন। আর সম্রাট তাঁর দরবারের লোকজন নিয়ে তা শুনতেন বসন্তোৎসব উপলক্ষে রাজদরবারে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত হতেন এইভাবে আকবরের রাজসভা জাঁকজমকে সকলকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল ।

৬. প্রশ্ন: ‘মনসবদারী প্রথা’ বলতে কি বোঝ ?

উত্তর : মনসবদারী প্রথা বা মনসবদারী ব্যবস্থা মুঘল শাসন-ব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ভারতবর্ষের বাইরে আর কোনও দেশেই মুঘল মনসবদারী প্রথার অনুরূপ ব্যবস্থার নিদর্শন পাওয়া যায়নি। মনসবদারী প্রথা ঠিক কোন সময় থেকে, এবং কিভাবে প্রচলিত হয়েছিল সেবিষয়ে বলা মুশকিল। তবে এমন বলা হয়ে থাকে যে, চেঙ্গিজ খাঁ তাঁর সৈন্যবাহিনীকে দশমিকের ভিত্তিতে সংগঠিত করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনীকে ১০এর গুণিতকে সাজিয়েছিলেন ।

সমসাময়িক তথ্য থেকে জানা যায় যে, আকবর ১৫৭৭ খ্রীস্টাব্দে যখন ভূমিরাজস্ব এবং অন্যান্য বিষয়ে – সংস্কার চালু করেছিলেন, তখন-ই মনসবদারী ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন মুঘল শাসনব্যবস্থায়। মনসবদার কথাটির সঙ্গে আবার আকবর জাঠ এবং সাওয়ার কথাটি যুক্ত করেন। যার অর্থ ছিল একজন মনসবদারের মর্যাদা এবং তিনি কত ঘোড়সাওয়ার, হাতী বা উট সর্বদা রাখবেন, প্রয়োজনে যাতে সেগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে হাজির করতে পারেন ।

আকবরের সময় থেকে যে মনসবদারী ব্যবস্থা চালু হয় তা মুঘল রাজত্বের পুরো সময়টা ধরে নানা পরিবর্তন ঘটেছিল মনসবদাররা সরকারের কাছ থেকে নিজেদের পদমর্যাদা অনুসারে এবং ঘোড়া, হাতী প্রভৃতির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নগদ অর্থে বেতন পেতেন মনসবদারী ব্যবস্থাটা ছিল খুবই জটিল, এবং তার দক্ষতা নির্ভর করত মুঘল সম্রাটের ব্যক্তিত্ব ও কর্মদক্ষতার ওপর। শাহজাহানের আমলে এই মনসবদারী ব্যবস্থা খুবই দক্ষতার সঙ্গে টিকেছিল । কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই ব্যবস্থা ক্রমশ ভেঙ্গে পড়ে সাম্রাজ্যের অস্তিত্বকে-ই বিপন্ন করে তুলেছিল ।

৭. প্রশ্ন : টীকা লেখ : দীন-ই-ইলাহী । ( অথবা, আকবরের ধর্মমত সম্পর্কে কি জান ? )

উত্তর : ধর্ম নিয়ে বাদানুবাদ আকবর মোটেই পছন্দ করতেন না। তিনি বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে নিয়ে আলোচনার ভিত্তিতে যে সাধারণ সূত্র বের করতে চেয়েছিলেন তা সফল হয়নি । ইবাদতখানার আলোচনা সভাকে তাই আকবর বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও আকবরের সত্য অনুসন্ধানের চেষ্টার কিছু কম হয়নি । বিভিন্ন ধর্মের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে আকবর শিক্ষা নিতেন। ধর্মের বক্তব্যগুলোকে বুঝাতে চেষ্টা করতেন। ‘আকবর ইসলাম বর্জন করে ‘তৌহিদ-ই-ইলাহী’ নামে এক নতুন ধর্ম প্রবর্তন করেছিলেন বলে বদায়ূনী মন্তব্য করেছেন । কিন্তু আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে আকবর ইসলামকে বর্জন করেননি। ইসলাম ধর্মের মূলসূত্রকে মেনেই তিনি ‘একেশ্বরবাদ’ বা তৌহিদ-ই-ইলাহী প্রবর্তন করেছিলেন ।

তৌহিদ-ই-ইলাহী প্রবর্তনের আশি বছর পরেও ‘তৌহিদ’ কথাটির পরিবর্তে ‘দীন’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছিল অর্থাৎ দীন-ই ইলাহী কে একটি নতুন ধর্ম বলে প্রচার করা হয়েছিল। আকবর যে নতুন ধর্ম বা ধর্মীয় চিন্তার প্রবর্তন করেছিলেন তাকে প্রকৃতভাবে একটি নতুন ধর্মের মর্যাদা দেওয়া যায় না । কারণ এই ধর্ম প্রচারের কোনও ব্যবস্থা তিনি নেননি। কেবল সেইসব ব্যক্তি যাঁরা এই ধর্ম গ্রহণে উৎসাহী এবং যাঁদের নাম আকবর নিজে অনুমোদন করবেন কেবল তাঁরাই সেই ধর্ম গ্রহণ করতে পারত, অন্যেরা নয় ।

৮. প্রশ্ন : আওরংজেবের রাজত্বকালে যে বিদ্রোহ অনুষ্ঠিত হয় তা সংক্ষেপে লেখ ।

উত্তর : আওরংজেবের রাজত্বকালে যে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল তাকে কোনমতেই একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা। যায় না। বরঞ্চ মুঘল রাজত্বকালে বিভিন্ন কারণে নানা বিদ্রোহ অনুষ্ঠিত হয়। তবে আওরংজেবের আমলে বিদ্রোহের তীব্রতা অনেকখানি বেড়েছিল। আওরংজেবের রাজত্বকালে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটেছিল প্রচুর। পূর্ব-ভারত থেকে শুরু করে উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং দক্ষিণ ভারতে আওরংজেব বিদ্রোহের সম্মুখীন হয়েছিলেন।

আওরংজেবের আমলে নানা কারণে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। কোনও কোনও ঐতিহাসি বিদ্রোহগুলোকে এক কথায় হিন্দুদের মুসলিম-বিরোধিতা বলে ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু আধুনিক গবেষণার প্রমাণিত হয়েছে যে মথুরা অঞ্চলের জাঠ বা মীরাট অঞ্চলের সৎনামীদের বিদ্রোহের পেছনে গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ দায়ী ছিল মুঘল যুগে কৃষকদের অধিকাংশই হিন্দু ছিল বলে তাদের বিদ্রোহকে ধর্মীয় কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সহজ। কিন্তু একটু বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, অত্যধিক করের বোঝা কৃষকদের বহন করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া নির্দিষ্ট রাজস্বের বাইরেও সরকারী কর্মচারীরা বাড়তি বা অতিরিক্ত কর আদায় করতো বলে কৃষকদের পক্ষে সারা বছর দুইবেলা খাবার সংস্থান করাই মুশকিল হত এমতাবস্থায় বিদ্রোহ ঘোষণা ব্যতীত অন্য আর কোনও পথ তাদের সামনে খোলা ছিল না অনেক ক্ষেত্রে আবার জমিদাররাও নিজেদের এলাকা বাড়িয়ে নেবার জন্য কৃষকদের বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিলেন এইভাবে অনুষ্ঠিত বিদ্রোহগুলো মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটাতে সাহায্য করেছিল ।

৯. প্রশ্ন: টীকা লেখ : অষ্টপ্রধান

উত্তর : মারাঠাদের রাষ্ট্রনায়ক ছত্রপতি শিবাজী যে শাসন-পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন তাতে রাজা, যিনি “ছত্রপতি’ নামে পরিচিত ছিলেন, তিনিই রাজ্যের সর্বময় কর্তা তবে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য তিনি কয়েকজন মন্ত্রী বা প্রধানের সাহায্য গ্রহণ করতেন আটজন মন্ত্রী নিয়ে যে মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছিল। তাকেই ‘অষ্টপ্রধান’ বলা হয়ে থাকে। আটজন ‘প্রধান’ বা মন্ত্রীদের মধ্যে একজন ছিলেন মুখ্যপ্রধান যাঁকে প্রধানমন্ত্রী বলা যেতে পারে । তবে আজকের দিনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কোন তুলনাই চলে না মারাঠা মুখ্য প্রধান আসলে ছিলেন ‘আটজন প্রধানের অন্যতম। নামেই তিনি ছিলেন ‘মুখ্য’ মুখ্যপ্রধান অবশ্য পরবর্তী কালে ‘পেশবা’ নামে মারাঠা রাজ্যের সর্বময় কর্তা হয়ে ওঠেন যাই হোক, মুখ্যপ্রধান ব্যতীত অন্যান্য সাতজন প্রধান ছিলেন অমাত্য, মন্ত্রী, সামন্ত, সচিব, পণ্ডিত রাও, সেনাপতি এবং ন্যায়াধীশ।

Leave a Comment