মুঘলযুগে ভারত | India in Mughal Period|Part 2

Mughal Period

১০. প্রশ্ন : শের শাহের শাসনব্যবস্থা কিরূপ ছিল ? অথবা শের শাহের শাসনব্যবস্থা সংক্ষেপে লেখ ।

উত্তর : ক. সূচনা : শের শাহ মাত্র পাঁচ বছরকাল রাজত্ব করেছিলেন। এই সময়ের মধ্যেও তিনি একজন শাসক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি যে শাসনব্যবস্থার পত্তন করেছিলেন মুঘলরা তাকে ভিত্তি করেই মুঘল শাসনের ইমারত গড়ে তুলেছিলেন। কেবল তা-ই নয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইংরেজরা-ও শের শাহের প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থার কোনও কোনও বৈশিষ্ট্যকে গ্রহণ করেছিল।

খ. বৈশিষ্ট্য : শের শাহের শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বেসামরিক ব্যক্তিদের দ্বারা শাসন। পরিচালনা করা । অর্থাৎ আগেকার সুলতানী শাসকরা সামরিক লোকজনের ওপর-ই বেশি নির্ভরশীল ছিলেন, কিন্তু শের শাহ তা কাটিয়ে উঠেছিলেন । শের শাহের শাসনব্যবস্থার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রাম থেকে কেন্দ্রীয় শাসনকে কয়েকটি ভাগে সুবিন্যস্ত করা । কতকগুলি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় ‘পরগণা’ । কয়েকটি পরগণা নিয়ে আবার ‘সরকার’ গঠিত হয়; এবং কয়েকটি সরকার নিয়ে প্রদেশ’। প্রাদেশিক গভর্নর বা শাসনকর্তার ক্ষমতা ছিল খুবই ব্যাপক ।

গ. কেন্দ্রীয় শাসন : শের শাহের আমলে কেন্দ্রীয় শাসনে সম্রাট-ই ছিলেন সর্বেসর্বা। তিনি মন্ত্রীদের হাতে অধিক ক্ষমতা দানের পক্ষপাতী ছিলেন না। যার ফলে সম্রাটের ওপর-ই দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়ায় সম্রাটের কর্মক্ষমতা বা দক্ষতা না থাকলে কেন্দ্রীয় শাসন টিকে থাকাই মুশকিল। যেমন শের শাহের হয়েছিল শের শাহের মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে ।

ঘ. রাজস্ব-ব্যবস্থা : শের শাহ শাসক হিসাবে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার ওপর। তিনি আবাদযোগ্য জমির মাপ করবার ২. শাসনব্যবস্থার ব্যবস্থা করেন, এবং কোন্ ফসলের কতটা সরকারী খাজনা হিসাবে দিতে হবে বৈশিষ্ট্য তার তালিকা বা রেকর্ড তৈরী করেন । এর ফলে একজন কৃষক জানতো যে তাকে কতটা শস্য খাজনা হিসাবে দিতে হবে। তাছাড়া শের শাহ সরকার এবং কৃষকের পারস্পরিক স্বার্থ বজায় রাখবার জন্য ‘পাট্টা’ এবং ‘কবুলিয়ত্’ প্রথার প্রবর্তন করেছিলেন। সরকার কৃষককে দিত ‘পাট্টা’ আর কৃষক সরকারকে প্রদান করত ‘কবুলিয়ৎ’।

ঙ. অপরাপর সংস্কার : শের শাহ তাঁর অপরাপর সংস্কারের জন্যই বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন । প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় কৃষকদের সাহায্যদান, মুদ্রাসংস্কার প্রভৃতির মাধ্যমে তিনি যেন আধুনিক একটি রাষ্ট্রের-ই ধারণা পোষণ করেছিলেন। তাছাড়া বাংলা থেকে সিন্ধু পর্যন্ত গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড তৈরির মাধ্যমে যাতায়াত ব্যবস্থাকে সহজ করে তুলেছিলেন । এইভাবে শের শাহ শাসক হিসাবে ভারতের ইতিহাসে তাঁর জায়গাকে স্থায়ী করেছেন।

১১. প্রশ্ন: আকবরের রাজ্যজয়ের বর্ণনা দাও । অথবা, বিজেতা হিসাবে আকবরের মূল্যায়ন কর ।

উত্তর : ক. সূচনা : আকবর একজন ঘোরতর সাম্রাজ্যবাদী হওয়া সত্ত্বেও অপরাপর সাম্রাজ্যবাদী শাসকের সঙ্গে তাঁর অনেক প্রভেদ ছিল। আকবর নিছক সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব নিয়েই রাজ্যরে প্রবৃত্ত হননি এবিষয়ে তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এই যে, ভারতের বৃহত্তর জনসমাজকে একই আনুগত্যে আনয়ন করা । তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, একমাত্র ঐক্যের মাধ্যমেই সাম্রাজ্যের শক্তি এবং সমৃদ্ধিকে বৃদ্ধি করা যেতে পারে, অন্য কোনওভাবে তা সম্ভবপর নয়।

খ. মালওয়া, গড় -কাতাঙ্গা প্রভৃতি বিষয় : আকবর নাবালক অবস্থায় যখন বৈরাম খাঁয়ের অবিভাবকত্বে ছিলেন তখন থেকেই মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার শুরু হয়। মালওয়ার যুবক রাজা বাজ বাহাদুরের বিরুদ্ধে মুঘল অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আধম খাঁ। আধম খাঁ প্রথমে বিজয়ী হলেও বাজ বাহাদুর পরে ক্ষ পুনর্দখল করে নেন । তখন দ্বিতীয় এক অভিযানে আকবর তাকে পরাস্ত করেন। গড়-কাতাঙ্গার বাণী দুর্গাবতী অসীম সাহসের সঙ্গে লড়াই করে পরাজিত হওয়ার মুখে আত্মহত্যা করেন। অতঃপর আকবর রাজস্থান, গুজরাট প্রভৃতি বিষয়ে মনযোগী হন ।

গ. রাজপুতানা, গুজরাট ও বঙ্গ বিজয় : রাজপুতানা জয় করবার প্রবেশ পথ ছিল চিতোর । চিতোর জয় করতে আকবরকে বেগ পেতে হলেও এই বিজয় তাঁর মর্যাদাকে অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছিল। চিতোর জয়ের সময় অনেক দুর্ধর্ষ রাজপুত যোদ্ধা মৃত্যুবরণ করেছিলেন। চিতোরের পরে রণথম্ভোর জয় করেছিলেন আকবর ইতিমধ্যেই যোধপুর রাজ্য আকবরের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল। গুজরাট জয় করা অর্থনৈতিক দিক দিয়েও বিশেষ প্রয়োজনীয় ছিল আকবরের। ফল ! গুজরাটের গুরুত্ব ছিল বলে আকবর তা দখল করে নিয়েছিলেন গুজরাটের পরেই বাংলার পালা। বাংলার আফগান শাসক দ থাকে পরাজিত করে আকবর কেবল বাংলাদেশকে মুঘল সাম্রাজ্যভুক্তই করেননি, বাংলার স্বাধীন সুলতানীর অবসান ঘটিয়েছিলেন । তাছাড়া বাংলার আফগান সুলতানকে পরাজিত করে আকবর মুঘল-আফগান প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটিয়েছিলেন ।

ঘ. উত্তর-পশ্চিম ভারত বিজয় : উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে বিজয় বিজয়াভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সেদিকে একটা প্রাকৃতিক সীমারেখায় পৌঁছানো যাতে বৈদেশিক আক্রমণকারীরা ভারতে সহজে আক্রমণ চালাতে না পারে । প্রথমে আকবর কাবুলে উপস্থিত হন । তাছাড়া উজবেকদের শায়েস্তা করবার জন্য কাশ্মীর, বালুচিস্তান, লাদাখ, এমনকি খাইবার গিরিপথ ও শত্রুমুক্ত করেছিলেন । বর্তমান পাকিস্তানের অন্তর্গত সিন্ধু পর্যন্ত তিনি দখল করেছিলেন।

৫. ওড়িষ্যা এবং দক্ষিণ ভারত বিজয় : বাংলার মুঘল শাসনকর্তা মানসিং আফগানদের হাত থেকে ওড়িষ্যা কেড়ে নিয়েছিলেন । দাক্ষিণাত্যে মুঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করতে গিয়ে আকবরকে বিজাপুর, গোলকুণ্ডা এবং আহম্মদনগরের সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছিল । আহম্মদনগর সহ অন্যান্য রাজ্যের পতন ঘটলেও আকবরের দাক্ষিণাত্য-বিজয় সম্পূর্ণ হয়নি দাক্ষিণাত্যের দুর্ভেদ্য দুর্গ বলে পরিচিত অসীরগড়ের পতন ঘটলে খান্দেশ মুঘলদের অধীনস্থ হয় অসীরগড় জয়-ই ছিল আকবরের সর্বশেষ সামরিক অভিযান।

এইভাবে আকবর রাজ্যজয়ের মাধ্যমে এক সুবিস্তৃত মুঘল সাম্রাজ্য গঠন করেছিলেন । কেবল তা-ই নয় তাতে সুশাসন প্রবর্তন করে তাকে সুগঠিত-ও করেছিলেন ।

১২. প্রশ্ন: আকবরের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে যা জান সংক্ষেপে লেখ । অথবা, শাসক হিসাবে আকবরের সাফল্যের পরিচয় দাও ।

উত্তর : ক. সুচনা : মুঘল সম্রাট আকবর ছিলেন মুঘল শাসনব্যবস্থার প্রকৃত স্থাপয়িতা। স্যার যদুনাথ সরকার আকবরের শাসনব্যবস্থাকে পারসিক এবং আরবীয় শাসন-পদ্ধতির সংমিশ্রণ বলে মতামত দিয়েছেন। তাছাড়া হিন্দু রাজস্বনীতির অনেক কিছু-ই আকবর অনুসরণ করেছিলেন। শের শাহের শাসনব্যবস্থার প্রভাবকেও কোনমতেই অস্বীকার করা যায় না। এইভাবে নানা ধরনের শাসনপদ্ধতিকে ভিত্তি করে আকবর যে শাসনব্যবস্থার কাঠামো গড়ে তুলেছিলেন তাকে স্বৈরাচারী বলা গেলেও স্বেচ্ছাচারী ব্যবস্থা বলে অভিহিত করা যায় না। আকবরের শাসনব্যবস্থার অপর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল এই যে, তিনি ধর্মীয় কোনও প্রভাবকে প্রশ্রয় দেননি। তাছাড়া তার প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থায় জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকলকে সমান চোখে দেখা হত।

খ. সম্রাট ও কেন্দ্রীয় শাসন : মুঘল সম্রাট ছিলেন শাসনব্যবস্থার সর্বোচ্চে। তাঁর ক্ষমতা সীমাহীন হলেও উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের মতামতকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। দেওয়ান, মির বক্সী, সদর-ই সুদার প্রভৃতি কর্মচারী নিজ নিজ বিভাগ দেখাশুনা করতেন। আকবরের শাসনব্যবস্থায় মনসবদারী প্রথা একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল।

গ. মনসবদারী প্রথা : আকবর সম্ভবত ১৫৭৭ খ্রীস্টাব্দে মনসবদারী প্রথার প্রবর্তন করেছিলেন । মনসবদারদের কতকগুলো দায়িত্ব পালনের শর্তে রাজকোষ থেকে বেতন দেওয়া হত। সেই বেতন দিয়ে। তাঁরা ব্যক্তিগত খরচ মেটাতেন এবং প্রয়োজনীয় ঘোড়া, হাতি, উট বা সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য ঐ ধরনের জন্তু-জানোয়ার রাখতেন । যুদ্ধের সময় বা প্রয়োজনে মনসবদারদের সেসব হাজির করতে হত।

ঘ. বিচার ব্যবস্থা : আকবর বিচারকার্য পরিচালনায় কোনপ্রকার পক্ষপাতিত্ব পছন্দ করতেন না। কাজীরা বিচার করতেন মুফতীদের সাহায্যে। মুফতীদের প্রধান কাজ ছিল আইনের ব্যাখ্যা করা। অবশ্য কাজীরা সর্বদা যে ন্যায়সঙ্গত বিচার করতেন এমন কথা বলা যায় না ঘ. বিচার-ব্যবস্থা যে কারণে ‘কাজীর বিচার’ কথাটা প্রচলিত হয় । সেসময়ে জেলখানা বলতে কিছু ছিল না। যে-কারণে দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দুর্গে-ই আটক চ. সামরিক ব্যবস্থা রাখা হত।

ঙ. রাজস্ব ব্যবস্থা: আকবর তাঁর রাজস্ব-বিষয়ক মন্ত্রী তোডরমলের সহায়তায় যে বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন তার মূল কথা ছিল জমি-জরীপ করা, জমির মান নির্ণয় করা এবং তারপরে রাজস্বের হার নির্ধারণ করা। সরকারী আয়ের প্রধান উৎস-ই ভূমিরাজস্ব ছিল বলে তা আদায়ের ব্যাপারেও যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল । রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীরা যাতে প্রজাদের ওপর কোনও নির্দয় ব্যবহার না করেন তার দিকে দৃষ্টি রাখা হত। তাছাড়া দুর্ভিক্ষ বা অভাব-অনটনের সময় রাজস্ব আদায়ে ছাড় দেওয়ার রেওয়াজ ছিল।

চ. সামরিক ব্যবস্থা : মুঘল সামরিক ব্যবস্থায় মনসবদারী প্রথা-ই ছিল প্রধান। তাছাড়া মুঘল সম্রাট পৃথকভাবে যে সৈন্য নিযুক্ত করতেন না, তা নয়। ‘আহদি’ নামে সৈন্যরা ছিল খুবই দক্ষ। তারা আবার বরকন্দাজ এবং তীরন্দাজ হিসাবে কাজ করত । বড় বড় সব বন্দুক বা গাদাবন্দুক চালাবার জন্য বন্দুকচি’ নিযুক্ত ছিল ।

এইভাবে আকবরের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যে-কোনও আধুনিক শাসনব্যবস্থার তুলনা করা যেতে পারে । বিদেশী পর্যটক বার্ণিয়ের মুঘল সৈন্যবাহিনী সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করলেও একথা অস্বীকার করা যায় না যে, পদাতিক বাহিনী ব্যতীত অপরাপর সৈন্যরা যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী ছিল; এবং তারা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করত।

১৩. প্রশ্ন : শাহজাহানের রাজত্বকালকে সুবর্ণযুগ বলে অভিহিত করা কতটা যুক্তিসঙ্গত ? অথবা, শাহজাহানের রাজত্বকালকে সুবর্ণযুগ বলা যায় কি ?

উত্তর : মুঘলসম্রাট আকবর যে বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন তা তাঁর প্রপৌত্র (নাতি) শাহজাহানের আমলে মোটামুটিভাবে অক্ষুণ্ণ ছিল ভারতবর্ষে তখন এমন কোনও শক্তি বা ব্যক্তিত্ব ছিল না যিনি শাহজাহানের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন ।

ক. প্রকৃতপক্ষে শাহজাহানের ক্ষমতা ছিল অপ্রতিহত। তাঁর জীবদ্দশায় কেউ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেনি । জীবনের একেবারে শেষ দিকে পুত্র আওরংজেবের হাতে শাহজাহানকে বিড়ম্বিত হতে হলেও তাঁর কর্মকালে, সামর্থ্যের দিনে তাকে বিপাকে কেউ ফেলতে পারেনি ।

খ. পিতা ও পিতামহের সঞ্চিত বিপুল সম্পদের অধিকারী শাহজাহান তাই জাঁকজমকে খরচ করতে

পেরেছিলেন কেবল সঞ্চিত সম্পদ-ই নয়, শাহজাহানের আমলে পশ্চিম এশিয়া এবং ইউরোপের সঙ্গে ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য চলতে থাকায় মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছিল ।

গ. শাহজাহানের রাজত্বকালে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের যে ঘটনা ঘটেছিল তা মোটেই তেমন গুরুতর হয়ে ওঠেনি। কারণ অতি সহজেই তাকে দমন করা সম্ভব হয়েছিল। সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে শাহজাহান তেমন সফলকাম হননি। কারণ কান্দাহার পুনর্দখল করবার উদ্দেশ্যে শাহজাহান যে সেনাবাহিনী সংগ্রহ করেছিলেন তাতে অর্থ ব্যয় হয়েছিল প্রচুর। কিন্তু এই ধরনের ছোটখাট ঘটনাকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও ক্ষতি কিছু নেই শাহজাহানের বৃহত্তর সাফল্যের পাশাপাশি এইসবের তেমন ক্ষতিকর প্রভাব কিছু ছিল না। বললেই হয় ।

ঘ. শাহজাহানের রাজত্বকাল স্মরণীয় হয়ে আছে সে-আমলে নির্মিত প্রাসাদ, দালান, ইমারত, মসজিদ প্রভৃতির জন্য বাস্তবিকপক্ষে শাহজাহানের রাজত্বকাল যদি কিছুর জন্য-ও স্মরণীয় হয়ে থাকে তাহলে সেগুলো তাঁর নির্মাণকার্য ।

উপরিউক্ত বক্তব্যের ভিত্তিতে একথা বলা যায় যে, শাহজাহান ছিলেন মুঘল রাজত্বের সবচেয়ে ভাগ্যবান পুরুষ এবং তাঁর রাজত্বকালকে অনায়াসেই সুবর্ণযুগ বলে অভিহিত করা যায়। মুঘল শাসনের আর কোনও পর্যায়েই সকল দিক দিয়ে সাম্রাজ্য এত উন্নতি করেনি এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আধুনিক ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ সুবর্ণযুগ অভিধা দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি করেছেন। তাদের যুক্তি হল এই যে, শাহজাহানের রাজত্বকালেই সাম্রাজ্যের এমন কতকগুলো দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে তাঁর রাজত্বকালকে মোটেই সুবর্ণযুগ বলে আখ্যায়িত করা যায় না ।

আধুনিক ঐতিহাসিক, যাঁরা শাহজাহানের রাজত্বকালকে সুবর্ণযুগ বলে অভিহিত করতে রাজী নন, তাদের মতে :

(ক) এই রাজত্বকালেই প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের অত্যাচারে কৃষক এবং শ্রমিকদের অবস্থা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল তাদের আর্থিক দুর্দশা চরমে পৌঁছেছিল । (খ) আমলাতন্ত্রের জন্য খরচ করে এবং স্মৃতিস্তম্ভ, মসজিদ প্রভৃতি নির্মাণ করে শাহজাহান যে অর্থ ব্যয় করেছিলেন তাতে তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদা বৃদ্ধি পেলেও সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। (গ) শাহাজাহানের আমলে অর্থের অপচয় তখনকার মতো সাম্রাজ্যের মর্যাদা বৃদ্ধি করলেও উত্তরাধিকারীদের আমলে তা দেউলিয়াপনায় পর্যবসিত হয়। (ঘ) সবশেষে বলা যেতে পারে যে, শাহজাহানের সময় থেকে সাম্রাজ্যের যেসব দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছিল পরবর্তী সময়ে তা-ই সাম্রাজ্যের পতন ঘটাতে সাহায্য করেছিল।