মুঘলযুগে ভারত | India in Mughal Period |Part 3

Mughal Period

১৪. প্রশ্ন : আওরংজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি আলোচনা কর ।

উত্তর : আওরংজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি কোনও স্থির এবং নিশ্চিত লক্ষ্য নিয়ে রচিত হয়নি । যার ফলে এক এক সময় পৃথক পৃথক উদ্দেশ্যই নীতিকে পরিচালিত করেছিল । আরও উল্লেখযোগ্য দিক হল, আওরংজেব প্রথম দিকে তাঁর দাক্ষিণাত্যে নিযুক্ত গভর্নরের ওপর দাক্ষিণাত্য সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব দিয়েছিলেন । কিন্তু পরবর্তী কালে যখন নিজে সেখানকার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন আগেকার অনুসৃত নীতি থেকে সরে এসেছিলেন । এইসব গাফিলতি দাক্ষিণাত্য সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছিল । যেকারণে বলা হয়ে থাকে যে, দাক্ষিণাত্য সমস্যা-ই আওরংজেবের পতন ঘটিয়েছিল ।

(ক) সিংহাসনে আরোহণের সময় আওরংজেব দাক্ষিণাত্যে দুইটি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন । যথা : বিজাপুর রাজ্যের কাছ থেকে কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করা, যেগুলো শাহজাহান আহম্মদনগর থেকে ছিনিয়ে বিজাপুরকে দিয়েছিলেন । আর দ্বিতীয় সমস্যা ছিল শিবাজী এবং তাঁর পিতার ক্রমাগত শক্তিবৃদ্ধিকে প্রতিহত করা । প্রাথমিক পর্যায়ে আওরংজেবের পক্ষে দুটি সমস্যার কোনওটির-ই সমাধান করা সম্ভব হয়নি । মুঘল গভর্নর জয় সিং বিজাপুর আক্রমণ করলেও মুঘল বাহিনীর পক্ষে জয়লাভ করা সম্ভবপর হয়নি । অবশ্য উৎকোচ প্রদান করে পরেদা, শোলহাপুর প্রভৃতির দুর্গরক্ষীদের হাত করে নেওয়া সম্ভবপর হয়। কল্যাণী, শোলহাপুর, পরেন্দা এবং বিদর মুঘল এলাকায় পরিণত হয়েছিল। দ্বিতীয় সমস্যার সমাধান কিছু হয়নি এই পর্যায়ে । অর্থাৎ মারাঠাদের শায়েস্তা করা সম্ভব হয়নি মুঘলদের পক্ষে।

(খ) আওরংজেবের দাক্ষিণাত্য নীতির দ্বিতীয় পর্যায়ে আছে বিজাপুর রাজ্যের দরবারের অভিজাতদের হাত করে মুঘলদের জন্য সমর্থন আদায় করা । ইতিমধ্যেই আবার গোলকুণ্ডা রাজ্যের প্রতিপত্তি বেড়ে গিয়েছিল । কেবল তা-ই নয়, গোলকুণ্ডার উদ্যোগে মুঘলদের বিরোধিতায় বিজাপুর এবং মারাঠারা জোটবদ্ধ হয়েছিল । মুঘলদের পক্ষে এই পরিস্থিতিতে কোনও শক্তির বিরুদ্ধেই কার্যকরীভাবে কিছু করা সম্ভব হয়নি ।

(গ) দাক্ষিণাত্য নীতির দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যর্থতার পরে আওরংজেব স্বয়ং সেখানে উপস্থিত হন ১৬৮১ খ্রীস্টাব্দে । এই পর্যায়ে আওরংজেব যখন দেখলেন যে মারাঠাদের বিচ্ছিন্ন করে গোলকুণ্ডা ও বিজাপুরকে দলে টেনে আনা সম্ভব হচ্ছে না, তখন তিনি বলপ্রয়োগ, অর্থাৎ যুদ্ধের দ্বারা বিজাপুর ও গোলকুণ্ডাকে জয় করতে উদ্যোগী হন । এই নীতি সফল হয়েছিল । প্রথমে তিনি বিজাপুর আক্রমণ করে তা দখল করে নেন (১৬৮৬)। তার পরের বছর গোলকুণ্ডার পতন হয়েছিল (১৬৮৭)। বিজাপুর ও গোলকুণ্ডার পরে বাকী ছিল মারাঠাদের দমন করার ব্যাপারটা । (ঘ) গোলকুণ্ডার পতনের পর থেকে ১৭০৭ খ্রীস্টাব্দে মৃত্যু পর্যন্ত আওরংজের মারাঠাদের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু মারাঠাদের মধ্যে অন্তর্কলহের বীজ বপন করে বা তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে তেমন কিছু সুবিধা করতে পারেননি। মারাঠারা অন্তর্কলহের শিকার হলেও তাতে মুঘলদেরই অসুবিধা হয়েছিল বেশি ।

আওরংজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি মোটেই তাঁর কূটনৈতিক জ্ঞানের পরিচয় বহন করে না। তিনি দাক্ষিণাত্যে স্বয়ং প্রায় কুড়ি বছর ব্যয় করেও লাভ তো কিছু হয়-ইনি বরঞ্চ এতে সাম্রাজ্যের ক্ষতি হয়েছিল অনেক বেশি মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাছাড়া সামরিক অভিযানের ব্যর্থতায় মুঘলশক্তির সম্মান ও সামরিক মর্যাদা হ্রাস পেয়েছিল।

১৫. প্রশ্ন : আওরংজেবের ধর্মনীতি সম্পর্কে যা জান লেখ।

উত্তর : ক. সূচনা : আওরংজেবের আমলে মুঘল সাম্রাজ্য বিস্তৃতির চরম শিখরে আরোহণ করেছিল। ইতিপুর্বে আর কোন সময়েই মুঘল সাম্রাজ্যের সীমানা এত সুবিস্তৃত ছিল না। আওরংজেবের ব্যক্তিগত কর্মক্ষমতা, নিয়মানুবর্তিতা প্রভৃতি গুণাবলী সাম্রাজ্যকে সুসংহত রাখতে সাহায্য করেছিল ঠিকই। তবে তাঁর রাজত্বকালে বিভিন্ন এলাকায় যে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল তা অস্বীকার করা যায় না। অর্থাৎ আওরংজেবের শাসনদক্ষতা সত্ত্বেও বিদ্রোহের ঘটনা তাঁর রাজত্বকালে প্রায়শঃই ঘটে চলেছিল। ঐতিহাসিকদের কোন কোন মহল এইসব বিদ্রোহের জন্য আওরংজেবের ধর্মনীতিকেই দায়ী করে থাকেন। আবার অন্যান্য অনেকে তাঁর অনুসৃত ধর্মনীতির মধ্যে যৌক্তিকতা-ও খুঁজে পান।

খ. গোঁড়া সুন্নী মুসলিম হিসাবে আওরংজেব : ব্যক্তিগত জীবনে একজন গোঁড়া সুন্নী মুসলিম হিসাবে। তিনি নিজেকে ‘গাজী’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ইসলামে যেসব অনুষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি সেইসব আওরংজেব বাতিল করে দিয়েছিলেন। এমনকি, তিনি মুদ্রায় প্রচলিত ‘কলমা’ ছাপ দেওয়ার রীতি তিনি ইসলাম-বিরুদ্ধ বলে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মুতাসিব’ নামে এক শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ করে তাদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছিলেন যাতে সাম্রাজ্যের কোথাও ইসলাম-বিরোধী কার্যকলাপ চলছে কিনা তার ওপর নজরদারি করতে।

একজন সাচ্চা মুসলিম হিসাবে আওরংজেব বিলাসিতাকে বর্জন করেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সাদাসিধে ধরনের জীবন যাপন করতেন। কেবল তাই নয়, রাজ দরবারের জাঁকজমককে তিনি পরিহার করবার জন্যও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।

গ. শাসন পরিচালনায় ইসলামের অনুশাসন আওরংজেব শাসনকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রেও ইসলামের = আওরংজে অনুশাসন মেনে চলতেন। যে-কারণে দেখা যায় যে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণে তিনি ইসলামীয় ধর্মশাস্ত্রবিদদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন এবং তাদের অনুমোদন থাকলে তবেই তিনি তা প্রবর্তন করতেন। এই পদ্ধতির মাধ্যমে তিনি একদিকে যেমন মুসলিম সম্প্রদায়ের, বিশেষত সুন্নী মুসলিমদের মনস্তুষ্টি করেছিলেন, অন্যদিকে তেমনি ইসলামীয় রীতি অনুসারে শাসনব্যবস্থা পরিচালন করবার মনোবাসনা কার্যকরী করেছিলেন।

ঘ. বৈষম্যমূলক বিধি-ব্যবস্থা প্রবর্তন : মুসলিমদের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যকে জনপ্রিয় করে তোলবার জন্য তিনি তাদের উপতক ছাড় দিয়েছিলেন। অথচ অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে তেমন কোন ছাড় দেওয়া হয়নি। আওরংজেবের বৈষম্যমূলক আচরণের সবচেয়ে দৃষ্টিকটু উদাহরণ হল অ-মুসলিমদের ওপর আরোপিত ‘জিজিয়া’ কর। আকবর জিজিয়া কর প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, কিন্তু আওরংজেব ইসলামীয় শাস্ত্রজ্ঞদের পরামর্শে তা আবার পুনরারোপিত করেন। আওরংজের এক সরকারী নির্দেশ জারী করে মুসলিম ব্যতীত অপর কোন ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম প্রতিষ্ঠান নির্মাণ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন।

ঙ. পরোক্ষভাবে নৈতিক উন্নতি সাধন : ইসলামের অনুশাসন অনুসারে শাসন পরিচালনা করলেও তাতে পরোক্ষভাবে ভারতীয় জনসাধারণের নৈতিক উন্নতি সাধন যে ঘটেনি এমন নয়। মুতাসির নামে কর্মচারীদের ওপর নির্দেশ ছিল যে তাঁরা যেন লক্ষ্য রাখেন দেশের সর্বত্র ইসলামীয় অনুশাসন অনুসারে নিয়ম-বিধি পালিত হচ্ছে কিনা। তা করতে গিয়ে ভাঙ এবং অন্যান্য মাদকদ্রব্যের বিক্রীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। তাছাড়া জুয়া খেলা ইত্যাদির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছিল। এইসবের ফলে যে কেবল মুসলিম সম্প্রদায়ই উপকৃত হয়েছিল এমন নয়— হিন্দু-মুসলিম-নির্বিশেষে সকলেই তার সুফল সমানভাবে পেয়েছিল।

চ. আওরংজেবের ধর্মনীতির মূল্যায়ন : সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে যে, আকবরের অনুসৃত উদার ধর্মনীতি থেকে সরে এসে আওরংজের হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। আওরংজেবের রাজত্বকালে জাঠ, স্যামী প্রভৃতি যে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল তার মূলে ছিল আওরংজের অনুসৃত অ-মুসলিম বিরোধী ধর্মনীতি। একথা অস্বীকার করা যায় না যে, অ-মুসলিমদের ধর্ম-প্রতিষ্ঠান নির্মাণের ওপর নানা বিধি নিষেধ আরোপ করে আওরংজেব তাঁর ধর্মীয় সংকীর্ণতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তথাপি মনে রাখতে হবে যে, আওরংজেব তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে ধর্মনীতির দ্বারা সবক্ষেত্রে প্রভাবিত হতে দেননি। ব্যক্তিগতভাবে একজন গোঁড়া সুদী মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও তিনি জানতেন যে, হিন্দুদের একেবারে দূরে সরিয়ে রাখলে সাম্রাজ্যের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। আওরংজেবের ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস এবং রাজনৈতিক নীতি উভয়ের মধ্যে সর্বদা পার্থক্য বজায় থাকেনি। তাছাড়া পরস্পর-বিরোধী নীতি অনুসরণ করায় আওরংজেব যে সাম্রাজ্যের ক্ষতিসাধন করেছিলেন তা একেবারে অস্বীকার করা যায় না।

১৬. প্রশ্ন: শিবাজীর শাসনব্যবস্থা আলোচনা কর ।

উত্তর ক. সুচনা : শিবাজী বিজেতা এবং মারাঠাদের সংগঠক হিসাবে-ই মূলত পরিচিত । কিন্তু একজন শাসক হিসাবেও তাঁর খ্যাতি কম নয়। দক্ষিণ-ভারতের সুলতানী শাসনব্যবস্থা থেকে উপকরণ গ্রহণ করলেও শাসনব্যবস্থা সংগঠনে তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিভা কম ছিল না। মারাঠা ছত্রপতি শাসনব্যবস্থায় সর্বোচ্চ আসন প্রাপ্ত ছিলেন। অর্থাৎ মারাঠা রাজ্যে রাজা, যার নাম ‘ছত্রপতি’ তিনি-ই ছিলেন সর্বেসর্বা। তার নীচে “অষ্টপ্রধান” নামে আটজন প্রধান বা মন্ত্রী কাজকর্ম করতেন। তবে এই ‘অষ্টপ্রধানকে মন্ত্রিপরিষদ যাবে না। কারণ রাজা তাঁর মন্ত্রীদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতেন না, বা ঐ ধরনের কোনও ক্ষমতা-ও মন্ত্রীদের ছিল না।

খ. অষ্টপ্রধান : অষ্টপ্রধান বা আটজন প্রধানের মধ্যে পেশওয়া’ ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অর্থ দপ্তর এবং প্রশাসন ব্যবস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। অষ্টপ্রধানদের অপরাপর মন্ত্রী বা প্রধান ছিলেন মজুমদার, ওয়াকিয়ানবীশ, চিটনিস, দবীর প্রভৃতি ন্যায়াধীশ বা পণ্ডিতরাও ছিলেন বিচার-ব্যবস্থার প্রধান ব্যক্তি ।

রাজস্ব-ব্যবস্থা : মারাঠাদের রাজস্ব-ব্যবস্থা মুঘলদের অনুকরণে রচিত হয়েছিল। মারাঠা রাজ্যে উর্বর জমির পরিমাণ খুবই অল্প ছিল যে-কারণে মারাঠাদের রাজস্ব ব্যতীত অন্যভাবেও অর্থ রোজগারের ব্যবস্থা করতে হত। যারা জমির ওপর বংশানুক্রমিকভাবে আনিকার ভোগ করতেন, সেইসব “মিরাসদার দের ওপর শিবাজী কঠোরভাবে নজরদারী করতেন। কারণ এঁরা রাজস্ব আদায়ের মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ-ই রাজকোষে জমা দিতেন। আর বেশির ভাগটা নিজেদের কাছে রেখে বিত্তশালী হয়ে উঠেছিলেন। এমনকি, মিরাসদাররা ছোট-খাট রাজার মতো হয়ে উঠেছিলেন। নিজেদের পৃথক পাইক-বরকন্দাজ রেখে রীতিমত শক্তিশালীও হয়ে উঠেছিলেন বলে শিবাজী এঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন যাই হোক, মারাঠা রাজ্যে আবাদী জমির অভাব ছিল বলে আশেপাশের মুঘল এলাকা থেকে শিবাজী ‘চৌথ’ এবং ‘সরদেশমুখী’ আদায় করতেন, এবং এইভাবে আয়বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছিলেন ।

ঘ. সামরিক বাহিনী : শিবাজীকে সর্বদাই যুদ্ধ-বিগ্রহ করতে হত বলে তিনি সামরিক সংগঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন । তিনি সামরিক বাহিনীর লোকজনকে নগদ অর্থে বেতন দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন। তবে কোনও কোনও ক্ষেত্রে যে তাদের ভূমিরাজস্ব ভোগ দখলের অধিকার বা ‘সরঞ্জাম’ দেওয়া হত না, এমন নয়। শিবাজীর সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হত । এমনকি, শত্রুরাজ্য থেকে লুট করা মালের-ও হিসাব রাখা হত। সাধারণভাবে শিবাজী তাঁর সেনাবাহিনীকে দুইভাগে ভাগ করেছিলেন। যথা : ‘শিলাদার’ এবং ‘পাগা’। পাগা সৈন্য আবার ‘বারগীর’ নামেও পরিচিত ছিল । শিলাপাররা সরকারের কাছ থেকে মাসিক বেতন পেত। দুর্গ রক্ষার দায়িত্ব ছিল পদাতিক বাহিনীর উপর । শিবাজী মারাঠাদের জন্য নৌ-বাহিনী গঠনের চেষ্টা করেছিলেন ।

এইভাবে শিবাজী মারাঠাদের জন্য একটি সুগঠিত শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন । ক্রমাগত মারাঠাদের যুদ্ধ-বিগ্রহ করতে হত বলে ছত্রপতির অর্থের প্রয়োজন হত অনেক। কিন্তু রাজস্ব সেই প্রয়োজন মেটাতে পারত না। যে-কারণে মারাঠারা লুট-পাটের ওপর অনেকখানি নির্ভর করত। এজন্য কেউ কেউ মারাঠা রাজ্যকে যোচ্ছ-রাষ্ট্র বলে অভিহিত করেছেন। অবশ্য মারাঠা রাজ্য আদৌ তা ছিল না।

রচনামূলক প্রশ্নাবলী :

১৭. প্রশ্ন: ভারত-ইতিহাসে শিবাজীর স্থান নির্ণয় কর।

উত্তর : ক. সূচনা : ভারতের ইতিহাসে যে কয়েকজন শাসক নিজ প্রতিভার পরিচয় রেখে গিয়েছেন তাঁদের কাজকর্মের মধ্যে দিয়ে মারাঠা বীর শিবাজী তাদের মধ্যে অন্যতম। শিবাজী রাজপুত্র ছিলেন না ছিলেন সামান্য একজন জায়গীরদারের পুত্র। নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়ে তাঁর বাল্যজীবন কেটেছিল। তাছাড়া মারাঠাদের সংগঠিত করতে গিয়েও তাঁকে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাসত্ত্বেও তিনি তাঁর লক্ষ্যে ছিলেন অবিচল। অসামান্য প্রতিভাবলে শিবাজী দাক্ষিণাত্যে এক মারাঠা সাম্রাজ্য গঠনে সমর্থ হয়েছিলেন। কেবল একজন সাম্রাজ্যের নির্মাতা হিসাবেই নয়, তিনি একজন মানুষ ও শাসক হিসাবেও নিজ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন।

খ. মুঘলদের সঙ্গে সংঘর্ষ : মুঘল সম্রাট ঔরংজেব দাক্ষিণাত্যে শিবাজীর কার্যকলাপে বাধা সৃষ্টি করবার জন্য বিজাপুর সুলতানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। বিজাপুর সুলতান আফজল খাঁকে প্রেরণ করে শিবাজীকে হত্যা করবার যে পরিকল্পনা করেন শিবাজী তা ভেঙে দিয়েছিলেন। আফজল বা নিজেই শিবাজীর হাতে মারা পড়েন। ঔরংজেব তারপরে সরাসরি শায়েস্তা খাঁকে প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু শিবাজীর হাতে তাঁর ও চরম বিপর্যয় ঘটেছিল।

শত চেষ্টা করেও ঔরংজেব যখন শিবাজীকে শায়েস্তা করতে পারেননি তখন বাধ্য হয়ে তিনি শিবাজীর সঙ্গে একটা সমঝোতা করে নেন। শিবাজীর কৃতিত্ব এখানেই যে তিনি দোর্দণ্ডপ্রতাপ মুঘল সম্রাট ঔরং জেবকে সমঝোতায় আসতে বাধ্য করেছিলেন, তাঁকে স্বাধীন রাজা হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য করেছিলেন।

গ. স্বাধীন মারাঠা রাজ্যের প্রতিষ্ঠা : শিবাজীর কৃতিত্বের আরও একটা বড় দিক ছিল ১৬৭৪ খ্রীস্টাব্দে মারাঠা রাজ্যের প্রতিষ্ঠা। ঐ বছর শিবাজী আনুষ্ঠানিকভাবে রায়গড়ের দুর্গে মহাসমারোহে তাঁর রাজ্যাভিষেক পালন করেন। তিনি এই অনুষ্ঠানেই ‘ছত্রপতি’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। মুঘল সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত ক্ষমতার দিনে শিবাজীর স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে তাঁর কৃতিত্বের পরিচয় বহন করে। কারণ সেই সময়ে এই সাহসিকতা আর কেউ-ই প্রদর্শন করতে পারেন নি।

ঘ. শাসক হিসাবে শিবাজী : একজন রাজনৈতিক সংগঠক হিসাবে স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠার জন্য শিবাজী যতই কীর্তিমান হোন না কেন শাসক হিসাবে তাঁর কৃতিত্বকে মোটেই ছোট করে দেখা যায় না। তিনি বিজ্ঞাপুর এবং আহমদনগরের শাসনব্যবস্থা থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ঠিকই তবে শিবাজী সাসনব্যবস্থাকে নিজের মত করেই গড়ে তুলেছিলেন। তাকে মারাঠাদের উপযোগী করে সাজিয়েছিলেন। শিবাজীর প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থায় ‘ছত্রপতি’ বা রাজা-ই ছিলেন সর্বক্ষমতাসম্পন্ন। ‘অষ্টপ্রধান’ নামে তাঁর একটি মন্ত্রিসভা অবশ্যই ছিল, তবে মন্ত্রীদের স্বাধীন ক্ষমতা কিছু ছিল না। অষ্টপ্রধানদের অন্যতম ‘পেশওয়া’ ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শিবাজীর ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থা আহমদনগর এবং মুঘলদের রাজস্ব ব্যবস্থার অনুকরণেই গড়ে তোলা হয়েছিল। জমির ওপর যারা বংশানুক্রমিক অধিকার ভোগ করতেন শিবাজী তাদের ওপর কঠোর নজরদারী করতেন, যাতে তাঁরা রাজস্ব ফাঁকি দিতে না পারে। শিবাজীর পরিচালিত এলাকায় যা রাজস্ব হিসাবে আদায় হত তার পরিমাণ বেশি ছিল না বলে তিনি পার্শ্ববর্তী মুঘল এলাকা থেকে ‘চৌথ’ ও ‘সরদেশমুখী” আদায়ের ব্যবস্থা করেছিলেন।

ঙ. শক্তিশালী রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন : একজন শাসক ও রাজ্য-প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে শিবাজী কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন ঠিকই। তবে তিনি যে একজন চতুর রাজনীতিজ্ঞ-ও ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় রাজ্যের ভিত্তিকে শক্তিশালী করবার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে। শিবাজী ‘দেশমুখ’, অর্থাৎ জমিদারদের ক্ষমতাকে খর্ব করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সব সুযোগ নষ্ট করে দিয়েছিলেন। তাছাড়া শিবাজী তাঁর রাজ্যের সামরিক শক্তিকে এমনভাবে সংগঠিত করেছিলেন যাতে সামরিক বাহিনীর লোকজন সর্বদা-ই যুদ্ধযাত্রায় উৎসাহিত বোধ করে।

চ. শিবাজীর পরধর্মসহিষ্ণু শিবাজী’ উপাধির সঙ্গে ‘গো-ব্রাহ্মণ প্রতিপালক’ উপাধিও গ্রহণ করেছিলেন। তাসত্বেও তিনি মোটেই পরধর্ম অসহিষ্ণুতাকে প্রজার দেননি। মুসলিমদের প্রতি তিনি প্রানী ছিলেন তার অনেক উদাহরণ আছে। খাফি খাঁ স্বয়ং শিবাজীর পরধর্মসহিষ্ণুতার কথা উল্লেখ করে গিয়েছেন। অনেক সময় তিনি মসজিদের ব্যয়নির্বাহের জন্য জমিজমাও দান করেছিলেন।

এইভাবে শিবাজী মারাঠা জাতিকে সংগঠিত করে যে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাতে মারাঠারা যেন এক নবজীবন লাভ করেছিলেন। ঐতিহাসিক আচার্য যদুনাথ সরকার শিবাজীকে হিন্দুদের মধ্যে সর্বশেষ সৃজনী প্রতিভা ও জাতিস্রষ্টা হিসাবে বর্ণনা করে গিয়েছেন। শিবাজীর অনুপ্রেরণাকে পাথেয় করেই মারাঠারা গোটা অষ্টাদশ শতাব্দী ধরে ভারতীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল।

Leave a Comment