মুঘলযুগে ভারত | India in Mughal Period |Part 4

Mughal Period Part 4

১৮. প্রশ্ন: প্রথম ও দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধের গুরুত্ব আলোচনা কর।

উত্তর : ক. সূচনা : ভারতবর্ষে মুঘল রাজত্বের ইতিহাসে প্রথম এবং দ্বিতীয় উভয় পানিপথের যুদ্ধই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম পানিপথের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় ১৫২৬ খ্রীস্টাব্দে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবরের সঙ্গে দিল্লীর ইব্রাহিম লোদীর। আর দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয় ১৫৫৬ খ্রীস্টাব্দে আকবরের সঙ্গে আদিল শাহের মন্ত্রী হিমুর। তিনি বিক্রমজিৎ’ নাম গ্রহণ করেছিলেন আলোচনার সুবিধার্থে দুইটি পানিপথের যুদ্ধকে পৃথকভাবে বিচার করা যেতে পারে ।

খ. প্রথম পানিপথের যুদ্ধ : প্রথম পানিপথের যুদ্ধকে ভারতে মুঘল শাসনের ভিত্তি স্থাপন বলা যেতে পারে। কারণ এই যুদ্ধে জয়লাভ করেই বাবর ভারতে তাঁর সাম্রাজ্য গঠনের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছিলেন (ক) পানিপথের প্রথম যুদ্ধ ছিল বাবরের কাছে চূড়ান্ত বিজয় । অর্থাৎ ইব্রাহিম লোদীর পক্ষে আর শক্তি সঞ্চয় করে বাবরকে যুদ্ধে আহ্বান করবার কোনও সুযোগ ছিল না। (খ) পানিপথের যুদ্ধে জয়লাভ করবার সঙ্গে সঙ্গেই বাবরের নির্দেশে হুমায়ুন আগ্রা দখল করতে অগ্রসর হন । তাছাড়া দিল্লী অধিকার করবার জন্যও বাবর জনৈক মাহদী দাজাকে প্রেরণ করেছিলেন । (গ) পানিপথের প্রথম যুদ্ধ বাবরের ভারতবর্ষে রাজনৈতিক অধিকার স্থাপনের পথ যেমন প্রশস্ত করেছিল তেমনি তাকে আবার নতুন নতুন সমস্যারও মোকাবিলা করতে হয়েছিল । আফগানদের সর্বোচ্চ দলনেতা ইব্রাহিম লোদী পরাজিত হলেও তাঁর অধীন যেসব আফগান সেনাপতি ছিলেন তাঁদের ব্যক্তিগত সামরিক ক্ষমতা তখনও লুপ্ত হয়নি । এদের নিজপক্ষে টেনে আনতে বাবরকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। (ঘ) বাবর প্রথম পানিপথের যুদ্ধে জয়লাভ করে নিজেকে আর্থিক দিক দিয়ে যথেষ্ট শক্তিশালী করে তুলতে পেরেছিলেন । আগ্রা এবং দিল্লীতে সংগৃহীত সম্পদ তাকে দুইভাবে সাহায্য করেছিল । যথা : প্রথম, অভিজাতদের মধ্যে যথেচ্ছভাবে সম্পদ বিলি করে বাবর তাঁদের নিজ দলে টানতে পেরেছিলেন ; এবং দ্বিতীয়, বাবর সেই সম্পদের সাহায্যে ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করবার সুযোগ লাভ করেছিলেন (ঙ) পানিপথের যুদ্ধে বাবরের জয়লাভ তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপকে উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে আগ্রায় সরিয়ে নিয়ে এসেছিল।

গ. দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ : আদিল শাহ শূরের সেনাপতি হিমু আগ্রা দখল করে দিল্লী অভিমুখে রওনা হয়েছিলেন । এই সংবাদ পাওয়ামাত্র আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁ হিমুর বিরুদ্ধে সসৈন্যে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন পাঞ্জাব থেকে। কারণ আকবর এবং বৈরাম উভয়েই তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন । যাই হোক, পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে বৈরাম খাঁয়ের নেতৃত্বে মুঘল বাহিনী হিমুকে পরাজিত এবং হত্যা করে । এই যুদ্ধের গুরুত্বকে এইভাবে সাজানো যেতে পারে (ক) আকবর এমন এক সময় হিমুকে পরাজিত করেছিলেন যখন তাঁর অবস্থা খুবই সমস্যাসংকুল । এই অবস্থার মধ্যে বৈরাম খাঁয়ের অভিভাবকত্বে মুঘল বাহিনীর সাফল্য মুঘলদের সামরিক মর্যাদাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল (খ) হিমুর পরাজয়ে আদিল শাহ শূরের-ও ভাগ্যবিপর্যয় ঘটেছিল । দুর্বল আদিল শাহকে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই খিজির খাঁ পরাজিত ও হত্যা করেছিলেন। যার ফলে আকবরের অপর এক শত্রুর বিরুদ্ধে নিজেকে আর অস্ত্র ধারণ করতে হয়নি ।

(গ) হিমুর পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে আকবর যেন মুঘল সাম্রাজ্যকেই পুনরুদ্ধার করেছিলেন । এই পুনরুদ্ধার সম্ভব না হলে মুঘল সাম্রাজ্য বলে কোনও কিছু ভারতবর্ষে আদৌ গড়ে উঠত কিনা সন্দেহ ।

এইভাবে বলা যেতে পারে যে, প্রথম ও দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধ ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দুটি ঘটনা ।

১৯. প্রশ্ন: আকবরকে মহান মুঘল সম্রাট বলা হয় কেন ? অথবা, আকবরের কৃতিত্ব আলোচনা করে তাঁর মহানতার পরিচয় দাও ।

উত্তর : ক. সূচনা : ইতিহাসে মহান নৃপতি তাঁদের-ই বলা হয়ে থাকে যারা সর্বপ্রকার সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে দেশ তথা দেশবাসীর মঙ্গল কামনায় শাসনকার্য পরিচালনা করে থাকেন। ভারতের ইতিহাসে মৌর্যসম্রাট অশোকের মহানুভবতা তাঁকে দেশ এবং কালের ওপরে স্থান দিয়েছে। তেমনি মুঘলসম্রাট আকবর সবদিক দিয়েই যে সফলতা অর্জন করেছিলেন তাতে তিনি দেশবাসীর শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠেছেন। তাকে ‘মহান’ অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে ।

খ. প্রথমত, আকবর যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন তার সমস্যা এবং বিপত্তির শেষ ছিল না। সে সময়ে ভারতবর্ষে রাজনৈতিক ঐক্য বলে কিছু ছিল না। তাঁর আত্মীয়-স্বজনের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ব্যতীত পিতার বিজিত এলাকার ও বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল । এমতাবস্থায় আকবর এক সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করে একের পর এক রাজ্য জয় করতে শুরু করেছিলেন। তবে ঘোরতর সাম্রাজ্যবাদী হলেও আকবর অকারণে রক্তপাতের পক্ষপাতী ছিলেন না। আনুগত্যের আহ্বানে সাড়া না দেবার পরেই প্রয়োজনে তিনি যুদ্ধের পথ গ্রহণ করতেন।

গ. দ্বিতীয়ত, আকবর একজন শাসক হিসাবেও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। শের শাহের প্রদর্শিত পথে তাঁরই বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী তোডরমল নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এক নতুন রাজস্ব-ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। আকবরের সময়ে যে নতুন ব্যবস্থার পত্তন হয়েছিল তা ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সময় পর্যন্ত বলবৎ ছিল কেবল রাজস্ব-ই নয়, প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও আকবরের সময়কার বৈশিষ্ট্যসমূহ পরবর্তী শত বছরেরও বেশিদিন টিকে ছিল।

ঘ. তৃতীয়ত, আকবর ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন কিন্তু তিনি সেই ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে মিশিয়ে। জনসাধারণের ওপর তা চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করেননি মধ্যযুগে এহেন উদার মানসিকতা বাস্তবিকপক্ষেই প্রশংসার যোগ্য আকবরের অন্যতম কৃতিত্ব হল এই যে, তিনি জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর প্রজার শুভেচ্ছা ও সহযোগিতা লাভের চেষ্টা করেছিলেন আর তাতে তিনি সফলও হয়েছিলেন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, হিন্দু ও মুসলিম এই উভয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত শক্তি ও আনুগত্য ব্যতীত মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না কেবল আদর্শ-ই নয়, আকবর তাঁর উপলব্ধিকে বাস্তবেও প্রয়োগ করেছিলেন । যোগ্যতা অনুসারে অনেক হিন্দুকে তিনি অতি উচ্চ রাজপদে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তাছাড়া বৈষম্যমূলক জিজিয়া কর রহিত করে হিন্দুদের মনে আস্থা ফিরিয়ে এনেছিলেন।

ঙ. চতুর্থত, আকবরের কৃতিত্বের অপর একটি দিক ছিল এই যে, তাঁর অনন্যসাধারণ জ্ঞানপিপাসা প্রচলিত বিশ্বাস এই যে আকবর নিরক্ষর ছিলেন। তাসত্ত্বেও তিনি অশিক্ষিত ছিলেন না। ধর্মতত্ত্ব, দর্শন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনীতি, সকল বিষয়ে-ই আকবর ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিত ব্যক্তিদের সমাবেশে ইবাদতখানায় যে গুরুপান্তীর আলোচনা হত আকবর তাতে রীতিমত অংশগ্রহণ করতেন ।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আকবরের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, পৃথিবীর বিভিন্ন যুগে, নানা দেশে যেসব নরপতি আবির্ভূত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে যাঁদের স্থান সর্বোচ্চে আকবর তাঁদের মধ্যে অন্যতম শ্রীম্যান নামে জনৈক বিদেশী আকবর সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে কবি এবং নাট্যকারদের মধ্যে যেমন শেক্সপীয়র, রাজনীতিবিদদের মধ্যে তেমনি মুঘল সম্রাট আকবর । এই উক্তির মধ্যে অতিশয়োক্তি যা-ই থাকুক না কেন, আকবরের কৃতিত্ব এবং মহানতা সম্পর্কে কেউ-ই সন্দেহ প্রকাশ করেননি ।

Leave a Comment